Script:

খোলা চিঠি – শুধু তোমাকে ‘কেলেঘাই’

বিষ্ণুপদ দাশ (শিক্ষক, নৈপুর শান্তি সুধা ইনস্টিটিউশন, পটাশপুর, পূর্ব মেদিনীপুর)

বিনা ভাষ্যে ছক ভেঙে আজ তোমার মুখোমুখি। জানি ‘কাটা ছাঁটা সোজা কথা’ও ইঙ্গিত ইশারার দোসর। সুখ-দুঃখের সালতামামিতে মোড়া আলোছায়ার ভাঙা আয়নায় বিচ্ছুরিত জলছবি। যে ছবিতে রঙ মেলানোর আবির খুজে ফিরি। এঁকে দিই জলের তিলক।

শুরু হোক স্ত্রোত্রপাঠ-

“সতত, হে নদ! তুমি পড় মোর মনে”

এ বন্দনা গান- একাধারে প্রেম ও পূজা। ছন্দিত তনু-মনে বয়ে চলা এক নদীর নাম। পেলব আশ্রয় খুঁজে বেড়ানো এক কাঙাল হৃদয় এসে দাঁড়ায়। এই পথ- এই নদী তার প্রেমাস্পদ। ‘জীবনের সব লেনদেন’ চুকিয়ে ‘পাখির নীড়ের মতো’ চোখের সন্ধানে তোমার কাছে যাওয়া। বিদেশ বিভুঁইয়ে বারবার মনে পড়েছে নৃত্য চপলা কপোতের অক্ষির মত স্বচ্ছতোয়া সে নদী- নারীর কেননা এখনো ‘নদীর মানে স্নিগ্ধ শুশ্রূষার জল’। যাযাবর জীবনে ‘গঙ্গার থেকে মিসিসিপি হয়ে ভল্লার রূপ’ দেখে ক্লান্ত পথিক চলার আনন্দে ছুটে চলে লোকোত্তরে। রূপানুরাগে মত্ত হয়ে আন্তরিক রতির দরদে সে বলে যায়-

“লাল সে গালের কালো তিলটির বদলে গো দিয়ে দিতে পারি সমরখন্দ ও বোখারারা”

এইভাবে নিঃস্ব হতে চায় প্রেমিক হৃদয়-। জীবনের ছদ্ম আবরণ খুলে তুমি যখন দেহখানি তুলে ধরো আমার দেবালয়ের প্রদীপ হয়ে, তখন মনে হয় প্রেম আর পূজা যেন সমার্থক। তখন দেখি-

“কেহ দেয় দেবতা চরণে কেহ দেয় প্রিয়ার গলায়”

এপর্যন্ত ঠিক ছিল। চমকে উঠি চিরন্তন সেই প্রশ্ন শুনে-

“এতদিন কোথায় ছিলেন?

শোনো, সমম্ভ্রম দূরত্বের কুহেলিকা সরিয়ে বরং বলা ভালো-

“এতদিন কোথায় ছিলে? পথ ভুলে তুমি কি এলে?”

এ ভাষা বোঝে না কেউ। হৃদয় সংরাগে মোড়া, গভীর আশ্লেষে সে শুধু এ জীবন ধন্য হতে চায়। নীড় গড়ে ওঠে। সন্ধ্যা ভাষার মতো কোন এক বোধের অগম তীরে নীরব প্রতীক্ষা।-

“ভবনই গহন গম্ভীর বেগে বাহি”-

প্রেমের ইদগাহে ঈক্ষণ জাগানো ভাষার পাঠোদ্ধারে আজকের চ্যাটজিপিটি ও গোলক ধাঁধায় ঘুরতে থাকে। সোশ্যাল মিডিয়ার ফিডে আসবে না কখনো।

তোমাকে বাঁধার সাধ্য কার? মুক্তধারা গতিপথে কলকল্লোলে বয়ে যাওয়া অপাপবিদ্ধ কে দেখে মনে বলে ওঠে-

“ওগো নদী আপন বেগে পাগল পারা”

জানি ‘সময় গিয়েছে চলে আমাদের কুড়ি কুড়ি বছরের পার।’ আজ পৌঢ় প্রহরে শ্রীহীন বর্তমান কারাবাসে নদী তীরে ফাগুন-পলাশের অর্ঘ্য সাজিয়ে মেঘদূত রচনার সাধ জাগে। মধু বসন্তে আজ সে দূরদ্বীপবাসিনী। দারুচিনি দ্বীপের ভিতর বসে থাকা তার কাছে।

“জল চাই একটু যদি দুহাত ভরে শুকনো বালু দেয় আমারে”।

তখন ভাবি, এ প্রিয়া কেমন প্রিয়া? এ নদী কেমন নদী? “নদী তুমি কোথা হইতে আসিয়াছো”?- এই দার্শনিক প্রশ্নে আমার কাজ নেই। সাকিন ঠিকানার তত্ত্বতালাশ করে বোহেমিয়ান হয়ে হাল ভাঙা পালছিড়া নাবিকের মত করুণার পাত্র হতে চাই না। বরং বলা ভালো- “তোমার অভিসারে যাব অগম পারে”। উত্তাল তরঙ্গপথে একাকী? প্রেমিক মন শুধু বলে-

“হ কপিলা চলুক সঙ্গে”।

সত্য শুধু কামনা। মরণ পিপাশা মিথ্যার একশেষ। তবু রোমান্টিক মন আশাবাদী,-

“পাড়ি দিতে নদী হাল ভাঙে যদি ছিন্ন পালের কাছি মৃত্যুর মুখে দাঁড়ায়ে জানিব তুমি আছো, আমি আছি”।

জন্মান্তর মানি বা না মানি তবু মনে হয়-

মোরা আর জনমের হংস মিথুন ছিলাম। ঝিলম নদীর চরে।”

ঝিলম নদী দেখা হয়নি, দেখা হয়নি শিকারাও। সন্ধ্যারাগে ঝিলমের স্রোত খাপে ঢাকা বাঁকা তলোয়ার হয়ে যায় নিবিড় ভাবনায়। পড়ন্ত বিকেলে নদী জলে সূর্যের কিরণ উজ্জ্বল আলোর স্তম্ভ রচনা করে। ধানসিঁড়ি নদী তীরের আকর্ষনেইতো বরাবর পৃথিবীতে ফিরে আসা। মনুষ্যেতর প্রাণী হয়েও শুনেছি মিশরীয় সভ্যতায় নীলনদ জয়া ও জননী। ইউফ্রেটিশ ও টাইগ্রিস যেন যীশুখ্রীষ্টের দুটি চোখ। সেই ধারায়-

“গঙ্গা আমার মা পদ্মা আমার মা দুই চোখে দুই জলের ধারা, মেঘনা যমুনা”।

জনিতার ঋণ ভুলি কি করে? সে যে নদী মাতৃকা।

এতক্ষণ হলো গৌরচন্দ্রিকা,- ‘সুরধনী তীরে উজোর’। এবার বলি- “এ চিঠি পাবে কিনা জানিনা”। শুধু জানি চিঠি অভিসারিকা। সে অবগুণ্ঠিতা। চুম্বনের মতো পবিত্র। গ্রামের ইস্কুলে শেখা- ‘আমাদের ছোট নদী’ পেরিয়ে তোমাকে চেনা। জল গড়াল অনেক দূর। তখন পূর্বরাগের সূচন পর্ব। ‘একটি নদীর আত্মকথা’ রচনায় উপমা সজ্জিত মানসী প্রতিমাকে উদ্দেশ করে লেখা ‘সখ্যতা’ শব্দের পরিবর্তে ‘সখ্য’ লেখার নিদান দিলেন বাংলা শিক্ষক; ব্যাকরণের দোহাই দিয়ে। মনে হল প্রেমের আবার ব্যাকরণ আছে নাকি? ভালোবাসায় অনাবশ্যক ‘অ-কার’ কি এমন মহাভারত অশুদ্ধ করবে? মনে মনে ভাবলাম-

“সমুদ্র কি রিক্ত হয়ে যাবে আমি যদি এক মুঠো ফেনা নিয়ে যাই?”

সে কথার মেলেনি উত্তর। এরপর রাগ অনুরাগে তোমার কাছে যাওয়া। আপন বেগে পাগল পারার তীরে বসে-

“দেখেছি সবুজ পাতা অভাগের অন্ধকারে হয়েছে হলুদ”

মরা নদীর সোঁতার ধারে সেদিন প্রথম হিজল চিনেছিলাম। যৌবনের আলো আঁধারিতে দেখেছিলাম সে গাছের জানালায় আলো আর বুলবুলির খেলা। অতীতচারি মনের ক্যানভাসে ধরাদিত কালিন্দী যমুনার অবিরত বংশীর ধ্বনি।

“তুমি কি যমুনার তীরে কদম্বের শাখে বসি বাজাতে বাঁশরী!”

অঞ্জলি ভরে গাইতাম-

“ওরে নীল যমুনার জল”

খুঁজে পেয়েছি প্রার্থনা গানের মতো জীবন ধন্য করা সে প্রেম কে। আবার বিতত যন্ত্রণায় তোমার কাছে গিয়ে বলেছি-

“বন্ধু, সকলই আমারই দোষ”।

এখন ভাবি সোজা পথে গেলে তোমার সঙ্গে যেতাম- ‘আমি জীবন ভর’। অদ্ভুত আঁধারে আজ অবরে সবরে এ প্রশ্ন করি- ‘তুমি বইছো কেন’? নিরুত্তর তোমাকে দেখে মনে হয়-

“একদিকে আমি শত সহস্র আর্তনাদ অন্যদিকে তুমি এক পরমাশ্চর্য না শোনার”

মনের দহনে কেয়াপাতার নৌকা নয়, তোমার জলে ভাসিয়েছি বিসর্জিত প্রেম প্রতিমাকে- যাকে গড়ে তুলেছিলাম “আশা দিয়ে, ভাষা দিয়ে, তাহে ভালোবাসা দিয়ে” তোমার চিঠিতো কম পাইনি। সে চিঠির ভাষা ‘আবঙমনসগোচর।’ মনের ট্রাম্পেটে দেখি- ‘বাবুই পাখির বাসা’, শামুক খোলের মেলা, গাঙশালিখের ব্যস্ততা, বিজন বনে কুররীর ব্যস্ত মধুর চলা, বেহুলার খেয়া, সাঁকো পারাপারের মায়াময় ছায়াঘেরা গোকুলানন্দের সমাধি যেন মিশরীয় পিরামিডের হাতছানি। তাল-তমাল, বাবলা, অর্জুন আর হিজলের থেকে স্বর্ণ শিখরে লুকোচুরি খেলে শেষে বিকেলে রোদের গন্ধ মাখা সে চিঠি এসেছিল লেফাফায় ভরে প্রেমপারাবত হয়ে-

“মনে পড়ে বসন্তের শেষে আসা ম্লান মৌন আগমনী সেই নিশি। যেদিন আমার আঁখি ধন্য হল তব আঁখি চাওয়া সনে মিশি”।

আবার বিরহের তীব্র দহনে তোমার কাছে অকপটে বলা যায়- জৈবিক এষণা; হোক না যতই নিষ্ঠুর কথন-

“প্রেম সত্য, প্রেমপাত্র বহু অগনন প্রেম এক প্রেমিকা সে বহু, বহু পাত্রে ঢেলে পিব সেই প্রেম সে সরাব লহু”।

পেলব হৃদয় ছেনে চুমে মনে হয় প্রেম শুধু কাছে টানে না, দূরেও ঠেলে দেয়। তাই কোটি মন্বন্তরেও তাকে ভোলা যায় না। সে এক আগুন, যা লাগালেও লাগে না, নেভালেও নেভে না।

“নাইবা পেলাম আমার গলায় তোমার গলার হার তোমায় আমি করব সৃজন এ মোর অহংকার”

চিঠিতো গোপন কথা বয়ে নিয়ে যায়। অনাবৃত মন তাই শম্বুক গতি নিয়ে ফিরে যায় মনের ডেরায়। অন্ধকারের উৎস হতে উৎসারিদ আলোর মত প্রেমাস্পদের কাছে মন হারাতে চায়। ফুরায় না তার কিছুই ফুরায় না। এ নদী হয়ে যায় ‘ভবনই;’ ভব-নদী। হৃদি-রত্নাকরের অগাধ জলে এসো শুচিস্নাত হই। সমাশোক্তিতে কত কথাই বলে গেলাম মৃন্ময়ের তাড়ায়। সেও তো এক নদীপ্রেমিক। মৃন্ময় তোমাকে বলি-

“সে যে ফিরে ফিরে আসে বছরের সেই মাসে; দেখো নিকি সেই শোভা সেই রূপ সেই রঙ?”

যাব্বাবা! তার নামটাই নিতে ভুলে গেছি। নাম শ্রবণেও যে পূর্বরাগের মতো আবহমান অশ্রুত ধ্বনি বাজে, স্মৃতিসত্তা ভবিষ্যৎ জুড়ে- ‘কেলেঘাই’- শুধু স্নিগ্ধ শুশ্রূষার জল”

পুনশ্চ- আর একটি কথা তোমায় বলি, জন্মদিনের উপহারে পড়ো আমার অবিনাশী প্রেমের স্বপ্ন আখর-

“তিমির বিনাশি হবার কলিজা আছে কি জানি না, তবু তমসায় জাগবো দু’জনে সবকিছু ভুলে, চৈতালী রাতে স্বপ্নের ঋণে বিষন্ন ভাঙা চাঁদের আলোয় আরও একবার ভালোবাসা যায় মৃত্যুর মুখে থুৎকার দিতে, প্রেয়সী, তোমার জন্মদিনে”।

Share the article

0 Comments